বাংলাদেশে শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এসএসসি শেষ করে উপযুক্ত এইচএসসি গ্রুপ নির্বাচন করা। এই সময়ে ছাত্রছাত্রীরা মূলত তিনটি প্রধান শাখার মধ্যে বেছে নেয়ঃ সাইন্স (বিজ্ঞান), আর্টস (মানবিক), এবং কমার্স (ব্যবসায় শিক্ষা)। তবে এই নির্বাচনটা যতটা না নিজের পছন্দ ও দক্ষতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, বাস্তবে দেখা যায় যে পরিবার, সমাজ কিংবা ফলাফলের ভিত্তিতে অনেক সময় বাধ্য হয়ে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ বেছে নিতে হয়।
সাধারণত যাদের ফল ভালো হয় তারা বিজ্ঞান চয়েস করে। এটা আমাদের সমাজে একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন ভালো ছাত্র মানেই সে বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সাফল্যের সংজ্ঞা শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষাতেও আছে অসীম সম্ভাবনা।
বিজ্ঞান গ্রুপ নির্বাচনের পেছনে সাধারণত থাকে ভবিষ্যতে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার লক্ষ্য। যেহেতু দেশে এবং বিদেশে এই দুই পেশার কদর অনেক, তাই অভিভাবকরা সন্তানদের বিজ্ঞানমুখী করতে চায়। কিন্তু এই চাপে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের মনের ইচ্ছা দমিয়ে পড়ে যায় এমন এক বিষয় নিয়ে, যেটা তার ভালো লাগার নয়। এতে করে পরে পড়াশোনায় মন বসে না, ফলাফলেও ভাটা পড়ে।
মানবিক বিভাগ অনেকেই কম গুরুত্ব দেয়, অনেক সময় বলা হয় “যারা কিছুই পারে না তারা আর্টসে যায়”। এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল এবং ক্ষতিকর। মানবিক বিভাগে ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, বাংলা ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ানো হয়। এগুলোর ভেতর দিয়ে একজন শিক্ষার্থী সমাজ ও মানুষের আচরণ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও নৈতিকতা সম্পর্কে গভীরভাবে জানার সুযোগ পায়। সাংবাদিকতা, আইন, শিক্ষকতা, সিভিল সার্ভিস এসব পেশার জন্য মানবিক শিক্ষার ভিত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া একজন সাহিত্যিক, গবেষক কিংবা নীতিনির্ধারকও হতে পারে এই বিভাগ থেকে।
অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ অনেক বাস্তবভিত্তিক এবং প্রয়োগমুখী। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে যারা উদ্যোক্তা হতে চায়, ব্যাংক, হিসাবরক্ষণ, বিপণন কিংবা অর্থনীতিতে কাজ করতে চায় তাদের জন্য এই বিভাগটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আমাদের দেশে এখন ছোট-বড় বহু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, সেই সঙ্গে ব্যাংক, এনজিও ও কর্পোরেট জগতের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণে। ফলে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার তৈরির পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত।
এইচএসসি-পরবর্তী গ্রুপ নির্বাচন শুধু ভবিষ্যতের চাকরির কথা ভেবে নয়, একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ, দক্ষতা এবং মানসিক পরিপক্বতার সাথে মানানসই হওয়া উচিত। একজন ভালো শিক্ষক যেমন একজন ভালো ডাক্তার বা ব্যবসায়ীর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, তেমনি একজন সমাজবিজ্ঞানী বা অর্থনীতিবিদ দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই এইচএসসি গ্রুপ নির্বাচনকে শুধুমাত্র “ভালো ফল করেছো = বিজ্ঞান পড়বে” এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখে, বরং “কোন বিষয়ে তুমি সত্যিকার অর্থে আগ্রহী এবং কোন পথে তুমি নিজের সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবে” এই চিন্তাধারার উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।



















































































