বই রিভিউঃ আউটলাইয়ার্সঃ ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েল-১

পর্বঃ ১

সফল মানুষদের নিয়ে অনেক গবেষণা আদিকাল থেকে চলে আসছে। একজন সফল মানুষ কেন সফল? এ প্রশ্নে উঠে আসে তাদের কঠিন পরিশ্রম, ভিশন ও অন্যান্য গুনের কথা। আমরা ও সেভাবে বলি যে অমুক এ কারণে সফল। কিন্তু আউটলাইয়ার্স বইটিতে গ্ল্যাডওয়েল সফলতাকে খুব ভিন্ন আংগিকে উপস্থাপন করেছেন। তিনি এমন কিছু কারণ খুজে বের করেছেন, যেগুলো সচারাচর আমরা খেয়াল করিনা বা এগুলোর প্রভাব যে থাকতে পারে তা বুঝিনা। সে দিকগুলো সম্পর্কেই কতগুলো উদহারণ দিয়ে বর্ণনা করেছেন লিখক। 

আমেরিকার রোজেতো নামক একটি শহরে ইতালী থেকে মাইগ্রেশন করে আসা একটি সমাজের মানুষের বিস্ময়করভাবে কোন হৃদ রোগ ছিলোনা। যে অল্প কয়জন ছিলেন তারা ও ৬৫ বছরের বেশী বয়সী মানুষজন। যে ডাক্তারের কাছে সে এলাকার মানুষ জন চিকিতসার জন্য আসতো, তিনি এ ব্যপারটি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন। প্রথমে ডাক্তার তাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখলো, তার রেজাল্ট হলো তারা ও অন্য এলাকার মানুষদের মতই একই খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে। তাদের বায়ু দূষণ নেই অন্যদের মত, কিন্তু অন্য এলাকার মানুষদের রোগ বেশী। পরবর্তীতে বিশদ গবেষণার পর বের হলো তারা সামাজিকভাবে বসবাস করে অর্থ্যাত তাদের সামাজিক সম্প্রীতি অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। এরা সবাই নিজেদের একই ভাবে, কোন ধরণের বিদ্ধেষে যায়না, সব অনুষ্ঠান সামাজিকভাবে করে, সবার জন্য আন্তরিকতা ও ভিন্ন। পারস্পরিক ভালোবাসায় পরিপূর্ণ তাদের সমাজ। পারিবারিক ভাবেও তারা অন্যরকম। যৌথ পরিবারে অনেকে মিলে বসবাস করে। তাদের দাদা-দাদী ও বৃদ্ধদের আলাদা করে যত্ন নেয়। মা-বাবার সেবা করেন ও একসাথে খাওয়া দাওয়া করে। এর পাশাপাশি তারা প্রার্থনা করে প্রতিদিন। নিজেদের ভালো রাখতে তারা সুন্দর একটি জীবন ব্যবস্থা তৈরী করে নিয়েছে যেটি সুস্থ্যতায় কাজ করছে। এ ঘটনায় একটি সমাজের জীবন যাত্রা যেভাবে তাদের সুস্থ্য রাখতে সাহায্য করেছে, তেমনি বাকী সব সফলতায় লেখক পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতির বিশাল প্রভাব দেখিয়েছেন। 

বিল গেটস, বিল জয়, গায়ক দল বিটলস সহ কতগুলো সফল মানুষ ও দলের সফলতার পেছনে একটি সূত্র জড়িত। সেটি হলো ১০০০০ ঘন্টার সূত্র। অর্থাৎ যে বা যারা নিজের সেক্টরে খ্যাতিমান হয়েছেন, এর কারণ হলো একই বিষয়ে ১০০০০ ঘন্টা কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন যেটি তাদেরকে অনন্য উচ্চতায় পৌছে দিয়েছেন। এটিকে তিনি দেখিয়েছেন ‘ম্যাথিউ ইফেক্ট’ হিসেবে অর্থ্যাত যার বেশী আছে, সে আরো পাবে। উল্লেখিত বিল গেটস বা বিটলস সংগীত দল ১০০০০ ঘন্টা চর্চার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের মেধা যতটুকু না সামনে নিয়ে গিয়েছে, তার চেয়ে বেশী কাজ করেছে সুযোগ গুলো। তারা শুধুমাত্র ঝোক বুঝে নিজেদের শানিয়ে নিতে পেরেছিল। 

হেনরী কোয়েল নামক একজন গবেষক ১২০-১৪০ এর মধ্যে আইকিউ আছে এমন ১৪৭০ বাচ্চার লিস্ট করে ও তাদের অবজার্ভ করেন যারা টারমাইটস নামে পরিচিত। তার আইডিয়া ছিল সব বাচ্চা ভবিষ্যতে তাদের জীবনে সমান পারফর্ম করবে। কিন্তু তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দেখা গিয়েছে তুখোড় প্রতিভাবানদের মধ্যে মাত্র ৮ জন গ্রাজুয়েশন শেষ করতে পেরেছিল। বাকীরা সেটা ও পারেনি। তাদের ফলাফলের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যাদের পারিবারিক অবস্থা ও সংস্কৃতি ভালো ছিল, তারাই অন্যদের তুলনায় ভালো করেছে বাকীরা করেনি। কারণ হিসেবে লেখক দেখিয়েছেন, পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও বিভিন্ন রকমের সুযোগ অন্যদের থেকে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। 

ক্রিস ল্যানগেন ও রবার্ট ওপেনহেইমার নামক ২ জন অসম্ভব মেধাবী মানুষদের জীবন তুলনা করে লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে তাদের আলাদা পারিবারিক অবস্থা ও সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পৌছে দিয়েছেন। ল্যানগান বেড়ে উঠেছিল এমন পরিবারে যেখানে সৎ বাবার শাসন ছিলো ও অর্থাভাবে কলেজ শেষ করতে পারেননি ও ব্যক্তিগত জীবনে খুব ভালো কিছু হয়নি। অন্যদিকে রবার্ট ওপেনহেইমার ল্যানগানের চেয়ে কম বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যানহাটন প্রজেক্টে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তার পিতা ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে পেরেছিলেন। ল্যানগান বিরাট লেভেলের একজন স্বশিক্ষিত মানুষ হলেও স্বীকৃতি পাওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। শুধুমাত্র পারিবারিক অবস্থাই ২ জন প্রতিভাবানের ২ রকমের আউটপুট দিয়েছেন বলে বইতে দেখানো হয়েছে। 

    SHARE THIS BLOG

    One Response

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Hello! I'm Tanin Zaid

    I love to read, travel, and help others to grow

    Recent Post

    Categories
    [quads id=2]
    Australia-তে Non-STEM ব্যাকগ্রাউন্ডদের কেমন সুযোগ রয়েছে?
    Australia
    Australia-তে Non-STEM ব্যাকগ্রাউন্ডদের কেমন সুযোগ রয়েছে?

    অনেকেরই ধারণা, অস্ট্রেলিয়ায় শুধু STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদেরই ভালো সুযোগ রয়েছে। তবে বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। Non-STEM- দের জন্যও স্কলারশিপ, পিআর

    Read More »
    SOP লেখার ক্ষেত্রে সবাই যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি করে থাকে
    Application Materials
    SOP লেখার ক্ষেত্রে সবাই যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি করে থাকে

    বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনে Statement of Purpose যাকে সংক্ষেপে SOP বলা হয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ডকুমেন্ট। এটা এমন একটা ডকুমেন্ট, যা অনেক সময় একই CGPA, একই

    Read More »
    জার্মানিতে Non-STEM শিক্ষার্থীদের জন্য কেমন সুযোগ আছে?
    Germany
    জার্মানিতে Non-STEM শিক্ষার্থীদের জন্য কেমন সুযোগ আছে?

    অনেকেই মনে করেন, জার্মানিতে শুধু Engineering, Computer Science বা অন্যান্য STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মোটেও তা নয়।

    Read More »
    বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আবেদনের সময়ে ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
    Application Help
    বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আবেদনের সময়ে ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

    বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে অনেকের প্রথম প্রশ্ন থাকে—”বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?” সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: না, তবে অনেক দিকে থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

    Read More »